মুশফিকের ‘নতুন দিন’, হেরাথের ‘নতুন চ্যালেঞ্জ’

টেস্টে বোলিংয়ের স্মৃতিতে প্রায় ধুলো পড়তে বসেছে, তবু এ ম্যাচে মোস্তাফিজের ওপর দৃষ্টি থাকবে সবার। কাল গলে অনুশীলনে বাংলাদেশের বোলিং কোচ কোর্টনি ওয়ালশও বাড়তি মনোযোগ দিয়ে দেখছেন মোস্তাফিজকে l 


টেস্টে বোলিংয়ের স্মৃতিতে প্রায় ধুলো পড়তে বসেছে, তবু এ ম্যাচে মোস্তাফিজের ওপর দৃষ্টি থাকবে সবার। কাল গলে অনুশীলনে বাংলাদেশের বোলিং কোচ কোর্টনি ওয়ালশও বাড়তি মনোযোগ দিয়ে দেখছেন মোস্তাফিজকে l এএফপি
দল ঘোষণার সময় বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন বলেছিলেন, ‘শ্রীলঙ্কাকে আমরা খাটো করে দেখছি না।’
এ কথার মানে কি এই নয় যে, বাংলাদেশ এখন প্রবল কোনো প্রতিপক্ষের সামনেও নিজেদের যথেষ্ট শক্তিশালী ভাবতে পারছে?
শ্রীলঙ্কার গলে এসে কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে জানিয়ে দিলেন, ‘এবার আমাদের খুব ভালো একটা সুযোগ।’ তার মানে বাংলাদেশ দল এখন যে অবস্থায়, তাতে এখানে এবার জয়টা উচ্চাশা নয়। প্রায় একই সঙ্গে ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সোজাসাপটা বলে দিলেন, ‘আমাদের দল খেলবে জয়ের লক্ষ্যে।’
সব মিলিয়ে যা দাঁড়াল, তাতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই টেস্টের চলতি সিরিজে বাংলাদেশ শক্ত লড়াই-ই লড়বে।
কাল গল স্টেডিয়ামের সংবাদ সম্মেলনে এসে শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক রঙ্গনা হেরাথও কিন্তু অতীতের লঙ্কান অধিনায়কদের মতো সদর্পে কথা বলেননি। যথেষ্টই বিনম্র তিনি। তাঁর মুখের প্রথম বাক্যটাই এমন, ‘এটি আমাদের নতুন চ্যালেঞ্জ।’ নতুন চ্যালেঞ্জের ব্যাখ্যাটাও তাৎক্ষণিক দিয়েছেন মাত্রই তৃতীয় টেস্টে নেতার ভূমিকায় নামতে যাওয়া বাঁহাতি স্পিনার। সেটি হেরাথ নতুন করে আর বলবেন কী! এটি তো সবারই জানা। চার বছর আগে শ্রীলঙ্কার মাটিতে সর্বশেষ দুই টেস্টের যে প্রথমটি ছিল এই গলেই। তাতে ইতিহাস সৃষ্টি করে গৌরবময় ড্র করেছিল বাংলাদেশ। অধিনায়ক মুশফিক করেছিলেন বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি, আশরাফুল খেলেছিলেন ১৯০ রানের ঝলমলে এক ইনিংস, নাসিরও করেছিলেন সেঞ্চুরি। স্কোরবোর্ডে জমা পড়েছিল ৬৩৮ রান। বাংলাদেশের দলীয় সর্বোচ্চ।
লিডও নিয়েছিল বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কা সেই প্রতিপক্ষ আর নেই। কুমার সাঙ্গাকারা, তিলকরত্নে দিলশান আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকেই বিদায় বলে দিয়েছেন। অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুসও এবার দলে নেই, তাঁকে বাইরে ঠেলে দিয়েছে চোট। সুতরাং অঙ্কটা সরল। শ্রীলঙ্কা অনেক কমজোরি দল। এমন শ্রীলঙ্কাকে কখনো সামনে পায়নি বাংলাদেশ। আর উল্টো দিকে মুশফিকের দল যেমন ক্রমোন্নতির ধারায় রয়েছে, তাতে দুর্দান্ত একটা লড়াই প্রত্যাশিত। যেটিকে বলা যেতে পারে ৫০-৫০ সম্ভাবনা। অর্থাৎ কে জিতবে, ঠিক করে দেবে মাঠের ক্রিকেট।
মুশফিকুর রহিম অবশ্য এই টেস্টে নামার আগে আশার বেলুনটা তত ফোলাননি। বাস্তবের জমিতেই পা রাখছেন বাংলাদেশের অধিনায়ক, ‘এটা আমাদের নতুন দিন।’ তবে ব্যাটিং গভীরতা, ভারসাম্যপূর্ণ বোলিং আক্রমণ, এই মাঠের সর্বশেষ টেস্টটির মধুর স্মৃতিকে তুলে ধরে যা বললেন, তার মধ্যেও ভালো কিছু করার, নতুন কোনো অর্জনের হাতছানি তো থাকেই। বাংলাদেশকে আগে ধরা হয়েছিল, দুদলের মধ্যে অভিজ্ঞতর। আসলে কি তাই? বাংলাদেশের পুরো স্কোয়াডের মিলিত টেস্টসংখ্যা দাঁড়ায় ২৬৪। শ্রীলঙ্কার সেখানে ২৮০। শ্রীলঙ্কাকে বলা হচ্ছে তরুণতর দল, কিন্তু তাদের গড় বয়স ২৮, বাংলাদেশের চেয়ে তিন বছর বেশি। আসলে বাংলাদেশ যদি একটু এগিয়ে থাকে, সেটি হলো দলের নিউক্লিয়াসের অভিজ্ঞতা। মুশফিক, সাকিব, তামিম ও মাহমুদউল্লাহ এই দলের নিউক্লিয়াস এবং এঁরা তিনজন মিলে খেলেছেন ১৭৮টি টেস্ট। শ্রীলঙ্কাকে যদি কোথাও পিছিয়ে রাখতে হয়, সেটি এই জায়গায়।
বাংলাদেশকে তাই সমীহই করছেন রঙ্গনা হেরাথ। এর কারণ সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, যার মধ্যে অবশ্যই নিউজিল্যান্ড সফর আছে, আছে ভারত সফরও, ‘আমরা জানি বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডে ও ভারতে ভালো ক্রিকেট খেলেছে। তাদের দলে আছে মুশফিক, তামিম, সাকিবের মতো খেলোয়াড়, যারা ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে।’
হীনবল হয়ে পড়লেও মুশফিক শ্রীলঙ্কাকে সমীহ করছেন অন্য কারণে। সেটি তারা ঘরের মাঠে খেলবে বলে, আর গত বছর অস্ট্রেলিয়াকে তিন টেস্টেই হারিয়ে দিয়েছিল বলে। ঘরের মাঠের সুবিধা শ্রীলঙ্কার কাছে কেমন, সেটি শুধু মুশফিক কেন, গোটা ক্রিকেট দুনিয়াই জানে। ঘরের মাঠে স্পিনের ফাঁদ পেতে শ্রীলঙ্কা ধরাশায়ী করেছে সব প্রতিপক্ষকেই। আরেকটি বিষয়, এখানকার ৩২-৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। সঙ্গে তীব্র আর্দ্রতা। এই ভ্যাপসা গরমে শ্রীলঙ্কা ছাড়া আর কোনো দলের পক্ষেই মনঃসংযোগ ধরে রাখাটা কত কঠিন, তা বলবে ইতিহাস।
তা গলের উইকেট কেমন হবে? টেস্ট শুরুর আগে সব দলেরই চোখ থাকে উইকেটের দিকে। মুশফিক এবং গোটা দল দুই দিন ধরেই উইকেটের ভাষাটা পড়তে চেয়েছেন। আগের দিন সামান্য ঘাসের আভাস ছিল, কাল দেখা গেল একেবারেই ন্যাড়া। এসব কিসের ইঙ্গিত মুশফিক তা বুঝবেন না, এমন তো নয়। তবে তিনি আশায় আছেন, শ্রীলঙ্কা স্পোর্টিং উইকেটই বানাবে। অন্ততপক্ষে প্রথম দিন থেকেই বনবন করে বল ঘোরে, এমন উইকেট নিশ্চয়ই নয়। স্পিনিং উইকেট বানালে তার নিদান বাংলাদেশের হাতে আছে। তবে অন্যান্য সময়ের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি গরম থাকায় উইকেট তিন দিনের পরই ভাঙতে শুরু করবে এবং সেই প্রস্তুতিও নাকি তাঁর দলের আছে।
হেরাথও অনেকটাই একমত, প্রথম দিন তিনেক এটি থাকবে ব্যাটিং-সহায়ক, তারপর থেকেই হয়তো হাত বাড়িয়ে দেবে তা মন্থর বোলারদের দিকে। এ জন্যই তিন স্পিনার নিয়ে নামবেন কি না, সে ব্যাপারে তিনি দ্বিধায়। দল ঠিক করবেন সকালে ভেবেচিন্তে। অবশ্য শ্রীলঙ্কান অধিনায়কদের কথায় কে কবে বেশি আস্থা রাখতে পেরেছে! এ দেশের উইকেট সব সময়ই যে প্রতিপক্ষের বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি খেলে।
গলের উইকেট হয়তো বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে। তবে বাংলাদেশ সাজিয়ে রেখেছে সব অস্ত্র। মুশফিকের বড় ভরসা এখানে মোস্তাফিজ। বাঁহাতি এই পেসার তাঁর বৈচিত্র্যে শ্রীলঙ্কানদের ভোগাবেন, সে ব্যাপারেও বাংলাদেশের অধিনায়ক নিশ্চিত। একাদশ কী হবে, সেটি বোঝা যায় গত কদিনের অনুশীলন দেখে। উইকেটকিপার লিটন দাসের দলে অন্তর্ভুক্তিতে হয়তো কপাল পুড়ছে সাব্বিরের।
দল যা-ই হোক, শ্রীলঙ্কায় অতীতের সেই মর্মান্তিক দিনগুলোকে লঙ্কানদের কিছুটা হলেও কি ফিরিয়ে দেওয়া যাবে? আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে এই প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ-বোধক হোক—এই আশাতেই তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ

Comments

Popular posts from this blog

আসছে হ্যালিও সিরিজের নতুন ফোন